রাজনীতির গুরু শাহ মোঃ খায়রুল বাশার চিশতীকে হারানোর ২৪ বছর

মোঃ রুহুল আমিন রাজু, জামালপুর প্রতিনিধি
আজ ৩ নভেম্বর। জামালপুরের বিএনপির রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, সাবেক জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ও সভাপতি, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মরহুম শাহ মোহাম্মদ খায়রুল বাশার চিশতীর ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি আমার রাজনৈতিক জীবনের গুরু, প্রিয় নানা ও অনুপ্রেরণার মানুষটিকে।
তাঁর হাত ধরেই একসময় আমার ছাত্রদলের রাজনীতিতে পথচলা ও উত্থান। তিনি শুধু আমাকে রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত করিয়ে দেননি, শিখিয়েছেন কীভাবে একজন কর্মীকে আদর্শ, সততা, সাহস ও সাংগঠনিক দক্ষতা নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। আমার রাজনৈতিক জীবনে আজ যতটুকু পরিচিতি ও অবস্থান তৈরি হয়েছে, তার পেছনে তাঁর অবদান গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
তাঁর সান্নিধ্যের কারণেই বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব, জামালপুরের কৃতী সন্তান, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মরহুম ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম তালুকদারের কাছে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। জামালপুর জেলা বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র নেতাদের সঙ্গেও আমার পরিচয় গড়ে ওঠে। এমনকি তাঁর হাত ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। জেলার বিভিন্ন দপ্তর ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি আমাকে নিয়ে যেতেন, পরিচয় করিয়ে দিতেন এবং উৎসাহ দিতেন।
আমার কাছে শাহ মোহাম্মদ খায়রুল বাশার চিশতী শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন অভিভাবক, শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক। আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে তাঁকে আমি স্নেহভরে ‘নানা’ বলে ডাকতাম। আমার নানাবাড়ি তাঁর বাড়ির কাছেই। সেই পারিবারিক সম্পর্কের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও আদর্শিক বন্ধন তাঁকে আমার জীবনে আরও আপন করে তুলেছিল।
মরহুম খায়রুল বাশার চিশতী ছিলেন একজন সৎ, সাহসী, আদর্শনিষ্ঠ ও দূরদর্শী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় রাজনীতি—সব ক্ষেত্রেই তাঁর বিচরণ ছিল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ন্যাপ-ভাসানী থেকে বিএনপিতে যোগ দেন এবং জামালপুরে দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি জামালপুর জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাজনীতির পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি হিসেবেও তাঁর অবদান ছিল। তিনি মেলান্দহ উপজেলার ৫ নম্বর নয়ানগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে ১৫ মার্চ ১৯৮৪ থেকে ২৮ জুলাই ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামালপুর-৩ (মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই নির্বাচনে তিনি ৩১ হাজার ৩২ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। তাঁর এই নির্বাচনী ফলাফল ওই অঞ্চলে তাঁর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও জনসম্পৃক্ততার পরিচয় বহন করে।
দলীয় রাজনীতিতে তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ ছিল সাংগঠনিক দক্ষতা, কর্মীদের প্রতি আন্তরিকতা এবং রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি অবিচল থাকা। তিনি নেতাকর্মীদের ভালোবাসতেন, তাঁদের উৎসাহ দিতেন এবং যোগ্যতা অনুযায়ী সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতেন। তাঁর মতো অভিজ্ঞ ও ত্যাগী নেতারা একটি রাজনৈতিক সংগঠনের শক্ত ভিত নির্মাণে যে ভূমিকা রাখেন, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। তাঁর সাহসী নেতৃত্ব, স্পষ্টবাদিতা, সততা, নিষ্ঠা ও সাংগঠনিক প্রজ্ঞা আমাকে আজও অনুপ্রাণিত করে। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন, রাজনীতি কেবল পদ-পদবি কিংবা ক্ষমতার বিষয় নয়; রাজনীতি মানুষের পাশে দাঁড়ানো, আদর্শের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা এবং কর্মীদের ভালোবাসার মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জনের নাম।
আজ দীর্ঘ ২৪ বছর তিনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর স্মৃতি, রাজনৈতিক অবদান এবং ভালোবাসা এখনো আমার হৃদয়ে অমলিন। মেলান্দহের চাকদহ গ্রামে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি ও মাজার তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রতি বছর ৩ নভেম্বর দলীয় নেতাকর্মী ও স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে তাঁর স্মরণে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর স্মৃতির প্রতি মানুষের এই শ্রদ্ধা নিঃসন্দেহে তাঁর কর্মময় জীবনের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
আজকের এই মৃত্যুবার্ষিকীতে আমার প্রত্যাশা, নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা তাঁর জীবন, আদর্শ, সততা, সাহসিকতা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড থেকে শিক্ষা নেবেন। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দল, দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করাই হোক তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
আমার প্রিয় রাজনৈতিক গুরু, আমার নানা—আপনি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু আপনার শেখানো আদর্শ ও স্মৃতি আমার রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
মহান আল্লাহ পাক মরহুম শাহ মোহাম্মদ খায়রুল বাশার চিশতীকে ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে নূরে পরিপূর্ণ করুন এবং জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।
