ড. রেজাউল করিম ফোক এন্ড হেরিটেজ মিউজিয়াম: লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণে – মো. মোশারফ হোসাইন

জামালপুর প্রতিনিধি: মানব সভ্যতার উষালগ্ন থেকে অদ্যাবধি লক্ষ্য করা যায় যে, মানুষ তার আপন কীর্তি ও কৃতিত্ব সম্ভারকে সংরক্ষণ করে। সংরক্ষিত জিনিসপত্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে প্রয়াসী হয়েছে অনেকে। প্রথিতযশা প্রকৌশলী, গবেষক ও সংগ্রাহক প্রফেসর ড. রেজাউল করিম দীর্ঘ সময় ধরে নিজস্ব প্রচেষ্টায় বিভিন্ন দেশের প্রাচীন ঐতিহ্য, দেশীয় লোকজ ও ঐতিহাসিক উপাদান সংগ্রহ করেন। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহ এবং বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস ঐতিহ্য, পুরাতত্ত্ব ও প্রত্নসামগ্রী, প্রাচীন মুদ্রা, পাণ্ডুলিপি, ঐতিহাসিক দলিলপত্র, বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতি, কুটিরশিল্প এবং ঐতিহাসিক নিদর্শনসমূহকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করার জন্য জামালপুর মেলান্দহের পূর্ব শ্যামপুর গ্রামে গড়ে তুলেছেন ড. রেজাউল করিম ফোক এন্ড হেরিটেজ মিউজিয়াম।
জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার শ্যামপুর একটি প্রত্যন্ত জনপদ। নদী, মাঠ আর গ্রামীণ জীবনের গন্ধ মেশানো এই এলাকায় বেড়ে উঠেন ড. করিম। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও তুরস্ক মিডল ইস্ট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি (METU)-তে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ এমএসসি এবং যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেন। সিঙ্গাপুর নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি (NTU) এবং অস্ট্রেলিয়া ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি, সিডনি (UTS)-এ অধ্যাপনা করেন। অবসর গ্রহণের পর নিজ মাতৃভূমি শ্যামপুরে রাবেয়া রশিদ মিয়া মেমোরিয়াল ট্রাস্ট করেন। এ ট্রাস্টের অধীনে অনেক দাতব্য ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। খলিল ভাইয়ের মাধ্যমে ড. করিমের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। এরপর আমি রাবেয়া রশিদ মিয়া মেমোরিয়াল ট্রাস্ট এর ট্রাস্টি বোর্ডের মেম্বার হই। ড. করিম এবং আমার বয়সের ব্যবধান অনেক, কিন্তু ভাবনায় আমরা কাছাকাছি। তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে আনন্দ পান। আমারও দীর্ঘদিনের স্বপ্ন প্রতিষ্ঠান গড়ার। নিজ হাতে গড়া এ জাদুঘর আমার কাছে অন্যরকম আপন লাগে।
ড. করিম পেশাগত জীবনে অনেক দেশ ঘুরেছেন, নানা জাতির মানুষ দেখেছেন, তাদের সংস্কৃতি আর জীবনযাপন কাছ থেকে দেখেছেন। অনেক মানুষ বিদেশে গিয়ে নিজের মাটিকে ভুলে যায়। ড. করিম ভোলেননি। দেশ-বিদেশে ঘুরে তিনি বুঝেছেন, একটি জাতির আসল পরিচয় তার নিজের সংস্কৃতিতে। যে জাতি নিজের অতীত ধরে রাখে, সে জাতি সহজে হারিয়ে যায় না। এই বোধ থেকেই তিনি নিজের সংগ্রহ নিয়ে একটি জাদুঘর গড়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। ব্যক্তিগত সংগ্রহ এ সকল জিনিস এখন জনগণের সম্পদে রূপান্তর হয়েছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে সবার জন্য উন্মুক্ত হবে এ জাদুঘর। বৃহত্তম ময়মনসিংহ এলাকার মানুষ যেসব জিনিস ব্যবহার করত, সেগুলো এখানে স্থান পাবে। পাশাপাশি থাকবে সারা বাংলাদেশের লোকজ সামগ্রী। এতে দর্শক দেখতে পাবেন, এলাকাভেদে আমাদের সংস্কৃতি কত রকম, আবার কোথায় তা এক সুতোয় বাঁধা।
বাংলাদেশের গ্রামের মানুষ নিজের হাতে নকশিকাঁথা, পাটি, শিকা, মাটির পুতুল আর নানা ঘরোয়া জিনিস বানিয়েছে। এসব কোনো কারখানায় তৈরি নয়, হাতের ছোঁয়া আর মনের মায়ায় তৈরি। কাঁসার জিনিস আর কাঠের কাজ আমাদের গ্রামীণ কারুশিল্পের বড় অংশ। একসময় কাঁসার বাসন ছাড়া বিয়ে বা অতিথি আপ্যায়ন ভাবাই যেত না। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে কাঁসার থালা, বাটি, গ্লাস আর ঘটি ছিল। বিয়েতে, উৎসবে, অতিথি আপ্যায়নে কাঁসার বাসনের কদর ছিল আলাদা। এখন এই শিল্প প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। জাদুঘরে এসব জিনিসপত্র দেখে নতুন প্রজন্ম জানবে পূর্বের ইতিহাস। কাঠের খোদাই করা দরজা, সিন্দুক, পালঙ্ক, পিঁড়ি আর নৌকা কিভাবে সাধারণ কারিগররা হাতের নিপুণতায় এসব জিনিস নির্মাণ করেছেন। আগের দিনে গ্রামের মানুষ অসুখে গাছগাছড়া, লতাপাতা আর শিকড়ের ওপর ভরসা করত। কবিরাজি ও লোকচিকিৎসার এই জ্ঞান পুরুষের পর পুরুষ ধরে চলে এসেছে। জাদুঘরে এ-সংক্রান্ত উপকরণ ও তথ্য থেকে নতুন প্রজন্ম অনুধাবন করবে সেই জ্ঞানের মূল্য। আগেকার মানুষের জীবনযাত্রা ও তাদের ঘরবাড়ি, রান্নাবান্না, পোশাক, খেলাধুলা, উৎসব আর দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্র পুরোনো কৃষি যন্ত্রপাতি লাঙল, জোয়াল, মই, কাস্তে, ঢেঁকি, কুলা আর নিড়ানির মতো যন্ত্রপাতি আমাদের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়। এখন যন্ত্রের যুগে এসব প্রায় চোখে পড়ে না। অথচ এগুলো দিয়েই আমাদের পূর্বপুরুষেরা মাঠে সোনা ফসল ফলিয়েছেন।
এ মিউজিয়ামে থাকবে ঐতিহাসিক দলিলপত্র। মহান মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র, ছবি, পুরোনো জমির দলিল, চিঠিপত্র, খাজনার রসিদ এবং স্থানীয় এলাকার ইতিহাস। এ জাদুঘরে সমাজের সকল শিক্ষিত-অশিক্ষিত, শিশু-বয়স্ক সহ সকল নাগরিক সমানভাবে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। তেমনি শিক্ষক, গবেষক, কবি সাহিত্যিক, দার্শনিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার আইনজীবী মোদ্দা কথা সকল শ্রেণির পেশাজীবী মানুষ অতীত ঐতিহ্য-সাংস্কৃতিক সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করবে। আধুনিক যুগে শহুরে সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির ভিড়ে বাঙালি যেন নিজস্ব শিকড় ও লোকজ ঐতিহ্য ভুলে না যায়, সেই সাংস্কৃতিক ও জাতীয় চেতনাকে জাগিয়ে রাখা। লোকশিল্প ও ঐতিহ্য নিয়ে আগ্রহী শিক্ষার্থী, গবেষক ও দর্শকদের জন্য একটি তথ্যসমৃদ্ধ গবেষণার ক্ষেত্র গড়ে তোলা। এসব অনেক অজানা ঐতিহাসিক নিদর্শন থেকে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বইয়ের বাইরে হাতে-কলমে ইতিহাস জানবে। শিক্ষক ও গবেষকরা পাবেন তথ্য ও নিদর্শনের একটি জ্ঞানভান্ডার। এ ছাড়া শিল্প ও সংস্কৃতির চর্চায় আগ্রহী মানুষ, বিশেষ করে চারুকলার শিক্ষার্থীরা এখান থেকে অনুপ্রেরণা পাবেন। লোকশিল্পের নকশা, রং আর গড়ন তাদের নিজের কাজকে নতুন দিশা দিতে পারে। ড. রেজাউল করিম ফোক এন্ড হেরিটেজ মিউজিয়াম একজন মানুষের মাটির প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ। বিদেশে শিক্ষা ও কর্মজীবনের পরও তিনি নিজের এলাকার কথা ভেবেছেন, এটাই সবচেয়ে বড় কথা। এই উদ্যোগ শ্যামপুর, মেলান্দহ, জামালপুর তথা ময়মনসিংহ বিভাগের জন্য গর্বের বিষয়।
লেখক: প্রভাষক, শিল্পকলার ইতিহাস, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ।
