মাদারগঞ্জে সরেজমিনে ছয় প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের চিত্র, এমপিওভুক্ত হচ্ছে কোনটি?
মোঃ মানিক ইসলাম, মাদারগঞ্জ প্রতিনিধি:
দেশের সুবিধাবঞ্চিত প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় নিশ্চিত করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে সরকার। এ উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে জামালপুর মাদারগঞ্জ উপজেলায় প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সুযোগ-সুবিধা ও বাস্তব অবস্থা নিয়ে খোঁজখবর নেওয়া শুরু হয়েছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো উপজেলা পর্যায়ের প্রতিবেদনে মাদারগঞ্জের ১৩টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের তথ্য রয়েছে বলে জানা গেছে।
গত ২০ অক্টোবর থেকে শুরু করে সরে-জমিনে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে গিয়ে ছয়টি বিদ্যালয়ের তথ্য, চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করছিঃ
সরেজমিনে দেখা গেছে, শুকনগরী এলাকার গিয়াস উদ্দীন প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, মাথাভাঙ্গা আবুল কাশেম বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিজম বিদ্যালয় এবং পুনর্বাসন কেন্দ্র, বাঁইশদাইর আগাউশ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, চর গোলাবাড়ী মির্জা আবুল কাশেম প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়, ঝাড়কাটা এস এ ইউ এ বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিজম বিদ্যালয় পুনর্বাসন কেন্দ্র এবং কয়ডা জাবল চেয়ারম্যান প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় —প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা, নিয়মিত উপস্থিতি, জনবল, যাতায়াত ব্যবস্থা ও শিক্ষা উপকরণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে।
গিয়াস উদ্দীন প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র
উপজেলার শুকনগরী এলাকায় অবস্থিত গিয়াস উদ্দীন প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান মিলনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী রয়েছে ৪৪৯ জন। তবে প্রতিদিন নিয়মিত উপস্থিত থাকে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ২৫ জন; এর মধ্যে নারী ১৭ জন এবং পুরুষ ৮ জন।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে শিক্ষকেরা নিজেদের অর্থায়নে দুটি অটোরিকশার ব্যবস্থা করেছেন। এগুলোর মাধ্যমে জুডখালী, মিলন বাজার, জোনাইল, খিলকাটি ও নাদাগাড়ীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষার্থীদের আনা-নেওয়া করা হয়। বিদ্যালয়ে হারমোনিয়াম, সাউন্ড বক্স, ঢোল, শিক্ষা উপকরণ, থেরাপির যন্ত্রপাতি ও খেলাধুলার সামগ্রী রয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য টিফিনে বিস্কুট, কলা, পাউরুটি ও খিচুড়ির ব্যবস্থাও করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্যমতে, ২১০ জন শিক্ষার্থী প্রতিবন্ধী ভাতা এবং ১৮৫ জন উপবৃত্তি পাচ্ছে। বাকি শিক্ষার্থীদের সহায়তার আওতায় আনতে আবেদনও করা হয়েছে। বিদ্যালয়টি সকাল ১০টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত চলে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান মিলন বলেন, শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে বেতন ছাড়াই কাজ করছেন। বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হলে তাঁদের আর্থিক অনিশ্চয়তা কমবে এবং শিক্ষা কার্যক্রম আরও ভালোভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
তিনি আরও জানান, জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দেওয়ার সুপারিশ করেছেন।
মাথাভাঙ্গা আবুল কাশেম বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিজম বিদ্যালয়
মাথাভাঙ্গা এলাকায় অবস্থিত আবুল কাশেম বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিজম বিদ্যালয় এবং পুনর্বাসন কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালে। প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি মোহাম্মদ আলীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ২৩৬ জন। প্রতিদিন উপস্থিত থাকে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন। এখানে ২৬ জন শিক্ষক-কর্মচারী কাজ করছেন বলে জানান তিনি।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ২০১৬ সালে বিদ্যালয়টি স্বীকৃতি পায় এবং ২০২০ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধন লাভ করে। তবে এখন পর্যন্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন পাননি বলে দাবি করেন সভাপতি মোহাম্মদ আলী।
চর গোলাবাড়ী মির্জা আবুল কাশেম প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়
চর গোলাবাড়ী এলাকার মির্জা আবুল কাশেম প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম জানান, বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী রয়েছে ৩৪০ জন। এর মধ্যে নিয়মিত উপস্থিত থাকে প্রায় ১৬০ জন। শিক্ষক রয়েছেন ২৫ জন; তাঁদের মধ্যে নারী ১৫ জন এবং পুরুষ ১০ জন।
বিদ্যালয়টিতে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী, শারীরিক প্রতিবন্ধী, অটিজম, সেরিব্রাল পালসি ও একাধিক প্রতিবন্ধিতা রয়েছে—এমন শিশুদের পাঠদান করা হয় বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত চলে কার্যক্রম। শিক্ষার্থীদের জন্য সাংস্কৃতিক উপকরণ ও থেরাপির যন্ত্রপাতি রয়েছে। শিক্ষার্থীদের টিফিনের ব্যবস্থা তাদের নিজেদের অর্থায়নে করে । সাতটি এলাকা থেকে শিক্ষার্থীদের আনা-নেওয়ার জন্য তিনটি ভ্যান রয়েছে বলে জানান পরিচালক। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের ১৬৫ জন শিক্ষার্থী প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছে।
বাঁইশদাইর আগাউশ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়
বাঁইশদাইর এলাকার আগাউশ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়টি ২০০৯ সাল থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে জানান বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রাসেল। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ১৮০ জন। প্রতিদিন উপস্থিত থাকে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন। শিক্ষক-কর্মচারী ও সহায়ক কর্মী মিলিয়ে রয়েছেন ৩৩ জন—এর মধ্যে ২০ জন শিক্ষক এবং ১৩ জন আয়া, পিয়ন ও ভ্যানচালক।
বিদ্যালয়টির নিজস্ব ৩০ শতাংশ জমি রয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত চলে পাঠদান। শিক্ষার্থীদের জন্য বিস্কুট ও কলার ব্যবস্থা করা হয়।
ঝাড়কাটা এস এ ইউ এ বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিজম বিদ্যালয়
ঝাড়কাটা এলাকার এস এ ইউ এ বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিজম বিদ্যালয় এবং পুনর্বাসন কেন্দ্রটি ২০১৭ সাল থেকে কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে জানান প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মো. মাসুদুর রহমান শোভন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ১৩৯ জন। নিয়মিত উপস্থিত থাকে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন। শিক্ষক রয়েছেন নয়জন; এর মধ্যে নারী ছয়জন এবং পুরুষ তিনজন।
প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ২৫ শতাংশ জমি রয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত পাঠদান চলে। এখানে চার ধরনের প্রতিবন্ধিতা রয়েছে এমন শিশুদের শিক্ষা দেওয়া হয় বলে জানান প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও নাশতার খরচ পরিবারগুলো বহন করে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কয়ড়া জাবল চেয়ারম্যান প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়,
কয়ড়া এলাকার জাবল চেয়ারম্যান প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বিদ্যালয়ে শিক্ষক উপস্থিত করানো সম্ভব হয়নি। এ কারণে বিদ্যালয়টির মোট শিক্ষার্থী, নিয়মিত উপস্থিতি, শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা, পাঠদান ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা যায়নি।
শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটির সময় জামালপুরে মাদারগঞ্জ উপজেলার ছয়টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক চিত্র জানার চেষ্টা করা হয়েছে। এ সময় বিদ্যালয়গুলোতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে শিক্ষার্থী সংখ্যা, নিয়মিত উপস্থিতি, শিক্ষক-কর্মচারী, পাঠদান, শিক্ষা উপকরণ, যাতায়াত ব্যবস্থা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
এমপিওভুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়ায় বিদ্যালয়গুলোর বর্তমান অবস্থা, কার্যক্রম ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার চিত্র তুলে ধরতেই এই সরেজমিন অনুসন্ধান।
