উপজেলার সংবাদজামালপুরসদরসম্পাদকীয়

বটতলা মোড়ের স্মৃতির ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার এখনই সময়


কাফি পারভেজ:

একটি জনপদের পরিচয় কেবল তার প্রশাসনিক সীমানা বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেই জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্মৃতি ও ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোই একটি অঞ্চলের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, উন্নয়নের নামে আমরা অনেক সময় আমাদের অতীতকে ভুলে যাই। জামালপুরের বকশিগঞ্জ উপজেলার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বটতলা মোড় একটি ঐতিহাসিক ও আবেগঘন স্থান, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক প্রজন্মের অসংখ্য স্মৃতি এবং ঐতিহাসিক বটতলা মোড় একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।

একসময় বকশিগঞ্জের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে ছিল একটি শতবর্ষী বিশাল বটগাছ। এটি শুধু একটি গাছ ছিল না ছিল মানুষের মিলনস্থল, বিশ্রামের ছায়া, পথচলার ঠিকানা এবং অসংখ্য স্মৃতির নীরব সাক্ষী। চারদিক থেকে এসে এখানে মিলিত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ চারটি সড়ক যা পশ্চিমে বাজার এলাকা, পূর্বে শেরপুর জেলা, দক্ষিণে জামালপুর জেলা শহর এবং উত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের ১১ নম্বর সেক্টরের কামালপুর। ফলে এটি ছিল শুধু একটি সড়কসংযোগস্থল নয়, বরং মানুষের মিলনমেলা, আড্ডা, বিশ্রাম ও বটতলা মোড় ছিল বকশিগঞ্জের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু।

বৃহস্পতিবার ও রবিবারের হাট শেষে গ্রামের মানুষ এই বটগাছের নিচে একটু জিরিয়ে নিতেন। বিকেল হলেই গ্রামের অনেক কিশোরের মতো আমরাও দাঁড়িয়ে থাকতাম বটতলায়। বাজার শেষে পরিবারের মুরব্বিরা এসে হাতে বাজারের ব্যাগ তুলে দিতেন, আর আমরা সেগুলো নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটতাম। তখন হয়তো বিষয়টি খুব সাধারণ মনে হতো, কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই আজ অমূল্য স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। কত মানুষের পরিচয়, আড্ডা, গল্প, হাসি-কান্না আর জীবনের অসংখ্য মুহূর্তের স্মৃতিগুলো কেবল একজন মানুষের নয় বরং পুরো অঞ্চলের বহু মানুষের শৈশবের অংশ।

আশির দশকে ঝড়ে শতবর্ষী বটগাছটির কিছু ডালপালা ভেঙে পড়ে। এটি ছিল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। পরে রাস্তা সংস্কারের কাজে বটগাছটি কেটে ফেলা হয়। কিন্তু এরপর যা ঘটেছে তা মানুষের উদাসীনতার ইতিহাস। তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বটতলা মোড়ের নামটি মানুষের মুখে আজও অম্লান। অথচ তার ঐতিহ্যকে যথাযথভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ আর দেখা যায়নি। নামটি টিকে আছে মানুষের মুখে কিন্তু তার মর্যাদা টিকে নেই বাস্তবতায়।

পরবর্তীকালে বকশিগঞ্জ পৌরসভার প্রথম মেয়র মো. নজরুল ইসলাম সওদাগর উদ্যোগ নিয়ে রড, সিমেন্ট ও বালু দিয়ে একটি কৃত্রিম বটগাছ নির্মাণ করেন। উদ্দেশ্য ছিল হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের স্মৃতি ধরে রাখা। উদ্যোগটি অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু একটি প্রতীক নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রয়োজন ছিল নান্দনিক পরিকল্পনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং একটি সুপরিকল্পিত নগর-দৃষ্টিভঙ্গি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কৃত্রিম বটগাছটি তার আকর্ষণ হারিয়েছে। বর্তমানে প্রথম দেখায় বোঝার উপায় নেই যে এটি একটি বটগাছের প্রতিরূপ। আজকের বটতলা মোড় প্রথম দেখায় তার ইতিহাসের কথা বলে না বরং অবহেলার কথাই বেশি বলে। যথাযথ নকশা, রক্ষণাবেক্ষণ ও নান্দনিকতার অভাবে এটি এখন অনেকটাই প্রাণহীন।

বটতলা মোড় মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কেউ এখানে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে, আবার রাজনৈতিক দলগুলোও বিভিন্ন সমাবেশ ও পথসভায় এখানেই বক্তব্য রাখে। স্থানটি তাদের বক্তব্যের মঞ্চ হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক দলগুলো এখান থেকে উন্নয়ন, পরিবর্তন ও জনকল্যাণের নানা প্রতিশ্রুতি দেয়। প্রতিশ্রুতি কিংবা প্রতিপক্ষের সমালোচনার ঝড় উঠলেও কিন্তু এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটির সৌন্দর্য সংরক্ষণ বা ইতিহাস রক্ষার বিষয়ে খুব কমই কথা শোনা যায়। আজ বটতলা মোড়ে দাঁড়ালে ইতিহাসের গৌরবের চেয়ে অব্যবস্থাপনাই চোখে পড়ে বেশি। দুঃখজনক হলেও সত্য, কৃত্রিম বটগাছটির চারপাশ এখন পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুনে প্রায় আচ্ছাদিত। এটি যেন রাজনৈতিক প্রচারণার বোর্ডে পরিণত হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে হতাশাজনক।
বকশিগঞ্জের মতো একটি ঐতিহাসিক জনপদের কেন্দ্রস্থল আরও পরিকল্পিত ও দৃষ্টিনন্দন হতে পারত। বিশেষ করে কামালপুর যা মহান মুক্তিযুদ্ধের ১১ নম্বর সেক্টরের গৌরবময় ইতিহাস বহন করে। সেই ইতিহাসকে ধারণ করে এখানে একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য, বিজয় স্মরণী বা মুক্তিযুদ্ধের স্মারক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। জায়গাটি আরো সম্প্রসারণ করে এখানে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল, মনোরম আলোকসজ্জা, বসার ব্যবস্থা, ফুলের বাগান ও নান্দনিক ল্যান্ডস্কেপিং এই মোড়কে একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত করতে পারে। তবেই বকশিগঞ্জের পরিচিতিও নতুন মাত্রায় যোগ হতো।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যদি পরিবেশ ও জায়গার উপযোগিতা থাকে, তবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে একটি প্রকৃত বটগাছও রোপণ করা উচিত। হয়তো সেই গাছ শতবর্ষী হতে সময় নেবে, কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সেটিই হবে নতুন ইতিহাসের ভিত্তি। নগর পরিকল্পনায় কেবল কংক্রিটের স্থাপনা নির্মাণই উন্নয়ন নয় উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয় যখন তা ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নাগরিক আবেগকে ধারণ করে। বটতলা মোড়কে ঘিরে মানুষের যে আবেগ সেটিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। কারণ, একটি শহরের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার স্মৃতি আর সেই স্মৃতিকে সংরক্ষণ করাই সভ্য সমাজের দায়িত্ব। পাশাপাশি কৃত্রিম বটগাছটিকেও শিল্পসম্মতভাবে সংস্কার করা, সব ধরনের পোস্টার-ব্যানারমুক্ত রাখা এবং রং-তুলির নান্দনিক ছোঁয়ায় নতুন রূপ দেওয়া প্রয়োজন।

ঐতিহ্য সংরক্ষণ কোনো বিলাসিতা নয় এটি একটি জনপদের আত্মপরিচয় রক্ষার দায়িত্ব। বটতলা মোড় শুধু একটি মোড় নয়, এটি বকশিগঞ্জের ইতিহাস, আবেগ ও শিকড়ের প্রতীক। বটতলা মোড় আজও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, জনপ্রতিনিধি, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগে বটতলা মোড়কে তার হারানো সৌন্দর্য ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনার এখনই সময়। ইতিহাস আমাদের উত্তরাধিকার তাকে সংরক্ষণ করাই আমাদের দায়িত্ব। কারণ যে জাতি তার স্মৃতি ও ঐতিহ্যকে লালন করে সেই জাতিই ভবিষ্যতের পথ আরও দৃঢ়ভাবে নির্মাণ করতে পারে।

এখন সময় এসেছে প্রতিশ্রুতির রাজনীতি থেকে দায়িত্বের রাজনীতিতে ফিরে আসার। বটতলা মোড়কে ঘিরে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হোক। ইতিহাসকে পোস্টারের আড়ালে নয়, নান্দনিক সংরক্ষণে তুলে ধরা হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *