বকশিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সম্মেলন এক পক্ষের দাবী অনিয়মতান্ত্রিক অপর পক্ষের দাবী বিধি মোতাবেক

কাফি পারভেজ, স্টাফ রিপোর্টার:
দীর্ঘ ৫ বছর পর ১৮ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জামালপুরের বকশিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন। এ সম্মেলনের আয়োজন উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়লেও দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি মিছিল সমাবেশে দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীরা বিব্রত অবস্থায় রয়েছে। এক পক্ষ বলছে ১৮ ফেব্রুয়ারির সম্মেলন প্রতিহত করা হবে। অপর পক্ষ সম্মেলনকে সফল করতে উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতা কর্মীরা আনন্দ মিছিল ও সমাবেশ করে যাচ্ছে। তৃনমূল নেতা-কর্মীদের প্রত্যাশা দলের দুর্দিনের কর্মীদের মূল্যায়ন হবে এ নতুন কমিটিতে।
বকশিগঞ্জ খয়ের উদ্দিন মাদ্রাসা মাঠে সাজানো হয়েছে সম্মেলনের বিশাল আকৃতির দৃষ্টিনন্দন মঞ্চ। ১৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় শুরু হবে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলা বিএনপির আহবায়ক মানিক সওদাগর এর সভাপতিত্বে সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন জেলা বিএনপির সভাপতি ফরিদুল কবির তালুকদার শামীম। প্রধান বক্তার বক্তব্য রাখবেন, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির কোষাধ্যক্ষ এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত। বিশেষ বক্তার বক্তব্য রাখবেন, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ময়মনসিংহ বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শরিফুল আলম। এতে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখবেন, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও জামালপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবু ওয়াহাব আকন্দ।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ গত ২০২০ সালে বকশিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটি গঠিত হয়। এতে মানিক সওদাগরকে আহবায়ক ও ফখরুজ্জামান মতিনকে সদস্য সচিব করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত বকশিগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে প্রার্থী হওয়ায় ফখরুজ্জামান মতিনকে বহিষ্কার করে বিএনপি।
সম্মেলনকে ঘিরে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। বকশিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রউফ তালুকদারে নেতৃত্বে সম্মেলন স্থগিতের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিএনপির পদ বঞ্চিত নেতাকর্মীরা।
অপরদিকে উপজেলা বিএনপির আহবায়ক মানিক সওদাগরের নেতৃত্বে সম্মেলন সফল করতে আনন্দ মিছিল করেছে বিএনপি ও সহযোগী অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
পাল্টাপাল্টি মিছিল সমাবেশে দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীরা বিব্রত অবস্থায় রয়েছে।
জানা যায়, ১৯৯৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর উপজেলা বিএনপিতে যোগদান করেন আব্দুর রউফ তালুকদার। কেন্দ্রীয় বিএনপি’র অনুমোদন ক্রমে ২০০০ সালে আব্দুর রউফ তালুকদার উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি এবং মানিক সওদারগর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০৩ সালে সম্মলনের মাধ্যমে ফের আব্দুর রউফ তালুকদার উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি এবং মানিক সওদারগর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
২০০৯ সালের ২২ নভেম্বর বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লা আল নোমানের উপস্থিতিতে এক সম্মলনের মাধ্যমে আব্দুর রউফ তালুকদার সভাপতি এবং ফরিদ উদ্দিন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে ছিলেন।
২০০৯ সালের আব্দুর রউফ তালুকদার উপজেলা পরিষদ এর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। সে সময় নির্বাচন কমিশনারের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয় দলীয় পদ থাকা অবস্থায় শপথ গ্রহন করা যাবে না। এ কারণে তিনি শপথ গ্রহনের আগে উপজেলা বিএনপির সভাপতি পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। পরবর্তিতে একই সালে নির্বাচন কমিশনারের অপর আরেকটি প্রজ্ঞাপনে তিনি ফের উপজেলা বিএনপির সভাপতি পদ ফিরে পান। ২০১৫ সালে ২১ নভেম্বর উপজেলা বিএনপি’র সম্মেলনে পুনরায় আব্দুর রউফ তালুকদার সভাপতি এবং ফরিদ উদ্দিন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
২০১৬ সালের ৭ অক্টোবর তৎকালিন কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম (টিপু) স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি আব্দুর রউফ তালুকদারের প্রাথমিক সদস্য পদসহ সকল পর্যায়ের পদ থেকে বহিস্কার করা হয়। পরে তার আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১২ নভেম্বর বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করে প্রাথমিক সদস্য পদ পুর্ণবহাল হয় কিন্তু তিনি পরবর্তীতে সদস্যপদ নবায়ন করেননি । এর পর থেকে বিএনপি’র রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন।
জানা যায়, ১৯৮৩ সালে বকশিগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদে প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আব্দুর রউফ তালুকদার। তিনি টানা চার বার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । ২০২৪ সালে সর্বশেষ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন।
অপরদিকে ১৯৯৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর উপজেলা বিএনপি’র সম্মেলনে ওবায়দুল্লা মেম্বার সভাপতি এবং মানিক সওদাগর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে সমঝোতার মাধ্যমে মানিক সওদাগর সভাপতি এবং ওবায়দুল্লা মেম্বার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপি রাজনীতিতে আসার পর থেকে মানিক সওদাগর ২০০০ ও ২০০৩ সালে উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদকে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে প্রার্থী হওয়ায় মানিক সওদাগরকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় বিএনপি। ফের ২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় বিএনপি তার বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়। এর পর মানিক সওদাগর ২০২০ সালে বকশিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এ ছাড়াও তিনি বকশিগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের এবং বিআরডিবি’র চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়াও বকশিগঞ্জ বনিক সমিতির সভাপতি ছিলেন।
বিএনপির সাবেক নেতা আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, বিগত সময়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটি না করে পকেট কমিটি করা হয়েছে। যে কারনে ত্যাগীরা কমিটিতে স্থান পায়নি। ত্যাগীরাই দলের নিবেদিত প্রাণ। যারা সম্মেলন স্থগিতের দাবি জানিয়েছে তারাই বিএনপির নিবেদিত কর্মী। কাউন্সিলের মাধ্যমে সকল ইউনিয়ন কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি গঠন করার পর সম্মেলনের দাবি জানান বিএনপির সাবেক এই নেতা।
উপজেলা বিএনপির আহবায়ক মানিক সওদাগর বলেন, দলের দু’সময়ে যাদের পাশে পাওয়া যায়নি তারা আজ ত্যাগী নেতা সেজেছে। সম্মেলন স্থগিত করতে নানা ষড়যন্ত্র করছে। বিগত ১৭ বছর যারা জেল জুলুম নির্যাতন সহ্য করেছে তারাই সম্মেলন সফল করবে। সম্মেলন সফল করতে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। যারা দলের নিবেদিত তারাই সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটিতে থাকবে। তৃণমূল বিএনপি তাদেরকেই মূল্যায়ন করবে। সম্মেলনের বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র সফল হবে না বলে জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন, বিগত দিনে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন, আন্দোলন সংগ্রাম, মামলা, হামলা, হয়রানি, গ্রেপ্তারের কারণে নির্ধারিত সময়ে সম্মেলন করতে পারেনি উপজেলা বিএনপি। ইউনিয়ন ও পৌরসভা ওয়ার্ড কমিটির নেতা কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে ১৮ ফ্রেব্রুয়ারি উপজেলা বিএনপি বিধি মোতাবেক সম্মেলন আহবান করা হয়েছে। সম্মেলনের সকল প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে।
