খাতেমুন মঈন মহিলা ডিগ্রি কলেজ : ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী রেজাউল করিম এখন কম্পিউটার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক!
কাফি পারভেজ, স্টাফ রিপোর্টার:
ইতিহাস বিষয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হয়ে ইতিহাসের প্রভাষক পদে চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বৈধতা নিয়ে মামলায় পরাজিত হয়ে একই কলেজের কম্পিউটার বিষয়ে সহকারী অধ্যাপক পদে চাকরিতে বহাল তবিয়তে থাকার অভিযোগ উঠেছে জামালপুরের বকশিগঞ্জ উপজেলার খাতেমুন মঈন মহিলা ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মো. রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে।
মো. রেজাউল করিম এমপিওভুক্ত হওয়া ইতিহাসের প্রভাষক পদের ইনডেক্স নম্বর ঠিক রেখে একই কলেজের কম্পিউটার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে চাকরি করলেও ইতিহাস বিষয়ের ইনডেস্ক নম্বর ব্যবহার করেই বেতনভাতা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে মো. রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে। জালিয়াতির মাধ্যমে প্রভাব খাটিয়ে এভাবে চাকরি করার বিষয়টি বেসরকারি কলেজ শিক্ষক নিয়োগবিধি লঙ্ঘনের শামিল বলে মনে করা হচ্ছে। মো. রেজাউল করিমের এই জালিয়াতির ঘটনাটি তদন্ত করে তাকে বরখাস্তসহ তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার দাবি উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মো. রেজাউল করিম জামালপুরের বকশিগঞ্জ উপজেলার সারমারা এলাকার মৃত আমজাদ আলী মিয়ার ছেলে। ছাত্রজীবনে তিনি মানবিক বিভাগে পড়ালেখা করেছেন। ১৯৮১ সালে এসএসসিতে তৃতীয় বিভাগ, ১৯৮৬ সালে এএইচসিতে দ্বিতীয় বিভাগ, ১৯৮৯ সালে ইতিহাস বিষয়ে দ্বিতীয় বিভাগের বিএ (সম্মান) এবং ১৯৯০ সালে ইতিহাস বিষয়ে দ্বিতীয় বিভাগে এমএ পাস করেন। এছাড়াও তার রয়েছে কম্পিউটার বিষয়ে আট মাস মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন কম্পিউটার সায়েন্স সনদ।
খাতেমুন মঈন মহিলা ডিগ্রি কলেজটি স্থাপিত হয় ১৯৯৪ সালে। প্রতিষ্ঠার শুরুতেই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হলে ইতিহাস বিষয়ের প্রভাষক পদের নিয়োগ পরীক্ষায় রীতা রানী মিত্র নামের একজন প্রথম স্থান, মো. রেজাউল করিম দ্বিতীয় স্থান এবং মো. আব্দুল খালেক নামের একজন প্রার্থী তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। ওই বছরের ১৮ অক্টোবর কলেজের সাংগঠনিক কমিটির সভায় প্রথম স্থান অধিকারী রীতা রানী মিত্রকে ইতিহাস বিষয়ের প্রভাষক পদে নিয়োগদান করার সর্বসস্মত সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। ওই বছরের ২০ অক্টোবর এক সভায় কলেজ কর্তৃপক্ষ যোগদানের তারিখ আগে পিছে করে মো. রেজাউল করিমকে চাকরি দেওয়ার জালিয়াতির প্রক্রিয়া শুরু করেন তৎকালীন অধ্যক্ষ।
কলেজের শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ কমিটি প্রথম ¯’ান অধিকারীকে সাতদিনের মধ্যে যোগদান করতে ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় স্থান অধিকারীকে নিয়োগদান করা যাবে মর্মে ওই নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারী রীতা রানী মিত্র এবং দ্বিতীয় স্থান অধিকারী মো. রেজাউল করিম উভয়কে একই দিনে অর্থাৎ ১৯৯৪ সালের ২৬ অক্টোবর নিয়োগপত্র ইস্যু করা হয়। কিন্তু নিয়োগপত্রে প্রথম স্থান অধিকারী রীতা রানী মিত্রকে ওই বছরের ২০ ডিসেম্বরের মধ্যে যোগদান করতে বলা হয় এবং দ্বিতীয় স্থান অধিকারী মো. রেজাউল করিমকে ১ নভেম্বরের মধ্যে যোগদান করতে বলা হয়। এভাবে জালিয়াতির উদ্দেশে যোগদানের পত্র দেওয়া এবং রেজাউল করিমকে প্রভাষক পদে নিয়োগের বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আদালতে মামলার রায়ে রীতা রানী মিত্র তার পদ ফিরে পান। বর্তমানে রীতা রানী মিত্র চাকরী থেকে অবসরে রয়েছেন।
এদিকে মামলায় হেরে যাওয়ার পরও ১৯৯৪ সালের ১ নভেম্বর ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক পদে যোগদানের পর ২০০২ সালের এমপিওভুক্ত হওয়ার ইনডেস্ক নম্বরটাকেই (৮৩৭৪১৩) কাজে লাগাতে মরিয়া হয়ে উঠেন মো. রেজাউল করিম। অথচ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর ওই ইনডেস্কের বিপরীতে তার বেতনভাতার সরকারি অংশ ¯’গিতও করেছে।
ফের জালিয়াতি ও প্রভাব খাটিয়ে তৎকালীন অধ্যক্ষ এবং কলেজ পরিচালনা পর্ষদকে মোটা অংকের টাকার ঘুষ দিয়ে নিয়মলঙ্ঘনসহ বিভিন্ন জালিয়াতির মাধ্যমে কম্পিউটার বিভাগের প্রভাষক পদে চাকরিটা বাগিয়ে নেন। ২০০৪ সালের ৮ আগস্ট তিনি কম্পিউটার বিভাগের প্রভাষক পদে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক পদে চাকরির এমপিওভুক্তি ও ইনডেস্ক নম্বর (৮৩৭৪১৩) ব্যবহার করে বেতনভাতা উত্তোলন করেন। একই সঙ্গে অবৈধপন্থায় জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতিও করিয়ে নেন। কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে ইতিহাস বিষয়ে স্নাতকোত্তর হয়ে নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কম্পউটার বিভাগের প্রভাষক পদে চাকরি বাগিয়ে নিয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়াও তিনি কলেজে উপস্থিত থেকেও কম্পিউটার বিষয়ে ক্লাস না নিয়ে মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক দিয়ে ক্লাস নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
মো. রেজাউল করিম মামলায় হেরে গিয়েও আগের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষকের ইনডেস্ক নম্বরের বিপরীতেই বর্তমান সময় পর্যন্ত কলেজ অধ্যক্ষ মো. বজলুল করিম তালুকদারের যোগসাজশে সহকারী অধ্যাপকের টাইমস্কেলসহ সকল প্রকার বেতনভাতা উত্তোলন ও সুবিধা ভোগ করে আসছেন। বেসরকারি কলেজে প্রভাষক পদে চাকরি পেতে হলে অবশ্যই প্রার্থীকে সেই বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পাশের সনদ থাকতে হবে।
কিন্তু মো. রেজাউল করিম ইতিহাস বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হয়ে কিভাবে তিনি কম্পিউটার বিভাগের প্রভাষক পদে চাকরি পেলেন তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। কম্পিউটার বিভাগের প্রভাষক পদে মো. রেজাউল করিমের ডিপ্লোমা ইন কমম্পিউটার সায়েন্স সনদটি আট মাস মেয়াদি। প্রশিক্ষণদানকারী প্রতিষ্ঠানটির কোর্স ২০০৪ সালের ৩০ আগস্ট শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তিনি ২০০৪ সালের ৮ আগস্ট কম্পিউটার বিভাগের প্রভাষক পদে যোগদান করেন। প্রতিষ্ঠানটির এ সনদটি নিয়োগবিধি শর্তের মধ্যে পড়ে কি না সেটাও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
এদিকে অভিযোগ প্রসঙ্গে মো. রেজাউল করিম বলেন, আমার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বৈধভাবেই সম্পন্ন হয়েছে।
