মাদারগঞ্জে উপবৃত্তির টাকা বিতরণে নানান অভিযোগ

মোঃ মানিক ইসলাম, মাদারগঞ্জ উপজেলা প্রতিনিধি
জামালপুরের মাদারগঞ্জে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা বিতরণে অনিয়ম ও আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে পাকরুল সূর্যমুখী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে সরকারি পেমেন্ট তালিকা ও বিদ্যালয়ে সংরক্ষিত তালিকার মধ্যে অসঙ্গতির অভিযোগও সামনে এসেছে।
মাদারগঞ্জ উপজেলার ১ নং চরপাকেরদহ ইউনিয়নের পাকরুল সূর্যমুখী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা নিয়ে অভিযোগের বিষয়টি সামনে আসে মাদারগঞ্জ সাংবাদিক ফোরামের একটি টিম বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে গেলে।
অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খলিলুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিদ্যালয়ের উপবৃত্তির একটি পেমেন্ট তালিকা সরবরাহ করেন। ওই তালিকা পর্যালোচনা করেই শুরু হয় অনুসন্ধান।
পেমেন্ট তালিকা অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের ১৭ জন শিক্ষার্থীর নাম উপবৃত্তির তালিকায় থাকলেও ১২ জন শিক্ষার্থী উপবৃত্তির টাকা পাচ্ছে বলে তথ্য পাওয়া যায়। পাশাপাশি ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী নিপা আক্তারও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উপবৃত্তির টাকা পাচ্ছে—এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে।
তবে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছ থেকে পাওয়া তালিকার সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের কাছে থাকা তালিকার মিল পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সাংবাদিকরা বিদ্যালয়ের উপবৃত্তির তালিকা দেখতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তা দেখাতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে সরকারি তালিকা ও বিদ্যালয়ের তালিকার পার্থক্য তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে পেমেন্ট তালিকায় থাকা মোবাইল নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করেও পাওয়া গেছে বেশ কিছু অসঙ্গতির তথ্য। কয়েকটি নম্বরে ফোন করলে সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। আবার কয়েকটি নম্বরে যোগাযোগ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, তারা উপবৃত্তির টাকা দুইবার পেয়েছেন। তবে তালিকায় থাকা সব নম্বরের মালিকানা ও লেনদেনের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আমেনা অভিযোগ করে জানায়, তার নামে উপবৃত্তির টাকা বরাদ্দ হয়েছে এবং সে দুইবার টাকা পেয়েছে। এরপর আর তার হিসাবে টাকা আসেনি। আমেনার অভিযোগ, টাকা দেওয়ার সময় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন তার কাছ থেকে দুই দফায় ৫০০ টাকা করে নিয়েছেন।
একই ধরনের অভিযোগ করেছে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সুয়াইয়াও।
অন্যদিকে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়ার বাবা মিজানুর রহমান বলেন, তার মেয়ের নাম উপবৃত্তির তালিকায় থাকলেও সে টাকা পাচ্ছে না। তার অভিযোগ, বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকই ওই টাকা আত্মসাৎ করছেন।
এলাকাবাসীর পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হয়েছে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন তার বোনের মেয়ে এবং বোনের সিম নম্বর ব্যবহার করে উপবৃত্তির টাকা গ্রহণ করেছেন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অভিভাবকদের অভিযোগ, কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা না দিয়ে নগদে হাতে দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রশ্ন—সরকারি নিয়ম অনুযায়ী উপবৃত্তির টাকা নির্ধারিত মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে শিক্ষার্থীদের হাতে নগদ টাকা দেওয়ার প্রয়োজন হলো কেন?
অভিভাবকদের দাবি, চলতি বছরের পাশাপাশি গত কয়েক বছরের উপবৃত্তির তালিকা, পেমেন্ট লিস্ট, বিতরণসংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা বের করা হোক।
অভিযোগের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “বক্তব্য দিতে আমি রাজি নই।”
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের এটিও গোলাম কিবরিয়া বলেন, “ভুলটি কার, এখন আমি সঠিকভাবে বলতে পারছি না। তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খলিলুর রহমান বলেন, “ওই স্কুলে আমি সরেজমিনে গিয়েছিলাম। তদন্ত করেছি। এর ভিত্তিতে শোকজের দিকে যাচ্ছি।”
অভিভাবকদের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের পাশাপাশি উপবৃত্তির কয়েক বছরের সরকারি তালিকা ও পেমেন্ট রেকর্ড যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
