আলোচিতজামালপুরবকশীগঞ্জ

বকশিগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রারকে অবরুদ্ধ প্রাণনাশের হুমকি দলিল পত্র তছরুপ, থানায় অভিযোগ, আটক এক, দলিল লেখকদের কর্মবিরতি

কাফি পারভেজ, জামালপুর প্রতিনিধি:

বকশিগঞ্জ উপজেলা সাব রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে নিজ এজলাসে হামলার চেষ্টার শিকার হন সাব রেজিস্ট্রার আব্দুর রহমান মোহাম্মদ তামিম। এ সময় হামলাকারীরা এজলাসে থাকা দলিল, দলিলের অবকল নকল, ৫২ ধারার রশিদসহ দাপ্তরিক কাগজ পত্র ছিড়ে ফেলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সাব রেজিস্ট্রার আব্দুর রহমান মোহাম্মদ বাদী হয়ে বকশিগঞ্জ থানায় ৭ জন নামীয় ও ১০ থেকে ১৫ জনকে অজ্ঞাতনামা একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার বিকেলে একজনকে আটক করেছে পুলিশ ।

বুধবার বিকেলে ৩টার দিকে অফিস চলাকালীন সময়ে সাব রেজিস্ট্রার আব্দুর রহমান মোহাম্মদ তামিমের ওপর হামলা চেষ্টা ও দলিল পত্র তছরুপের ঘটনাটি ঘটে। রাতেই বাদী হয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করেন বকশিগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রার আব্দুর রহমান মোহাম্মদ তামিম।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়,বকশিগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুর রহমান মোহাম্মদ তামিম এজলাসে দলিল রেজিস্ট্রি সময় দেওয়ানগঞ্জের সাপমারী কলেজ পাড়ার মোঃ ইদ্রিস আলীর স্ত্রী রেহেনা বেগম (৪৬) দাতা হিসাবে দলিল লেখক মোঃ শহীদুল্লাহ কর্তৃক একটি হেবা ঘোষণার দলিল এজলাসে উপস্থাপন করেন। দাতার শুনানিকালে দাতা স্বীকার করেন যে, সমুদয় টাকা বুঝিয়া পেয়েছে এখন বকশিগঞ্জ চরকাউরিয়া চন্দেরবন তিনানীপাড়া মোঃ আলমগীর হোসেনের স্ত্রী তার বোন রুবিনা আক্তারকে (৪৫)দান করবেন। এ সময় সাব রেজিস্ট্রার বলেন, টাকা বুঝিয়া পাইলে সেটা দান পত্র হয় না, সাব কবলা করতে হয়। দলিল হেবা করলে সরকার রাজস্ব পায় মাত্র ২,০১০/- টাকা। অপরদিকে সাব কবলা করলে সরকার রাজস্ব পায় প্রায় চার লক্ষ টাকার উপরে। একই দলিল খন্দকার মোহাম্মদ আলী হাসান (৬০), আমার এজলাসে দাখিল করেন। আমি আবার দলিল দাতার শুনানী করলে আগের মতই টাকা বুঝিয়া পাইছেন মর্মে স্বীকার করেন। এ সময় তিনি দলিল টা করার জন্য জোড়াজুড়ি করেন। সাব রেজিস্ট্রার তাকে বুঝায় যে, সরকার আপনাকে লাইসেন্স প্রদান করেছেন সরকারী রাজস্ব আদায়ের সাহায্য করার জন্য আপনি কেন সরকারের রাজস্বের ক্ষতি করতে চাচ্ছেন। একথা বলার পর এজলাসের সামনে সেবা গ্রহীতাদের উপস্থিতে আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন। পরবর্তীতে অসৎ আচরণের জন্য সর্তক করে অর্ডার বুকে লিখেন। এসময় ক্ষীপ্ত হয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন তিনি। পরে সকল বিবাদিসহ অন্যান্য অজ্ঞাতনামা ১০/১৫ জন নিয়ে আক্রমন করার জন্য এজলাসে প্রবেশ করেন। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে সাব রেজিস্ট্রার খাস কামরায় চলে যায়। বিবাদীগণ সাব রেজিস্ট্রারকে না পেয়ে এজলাসে থাকা দলিল, দলিলের অবিকল নকল, ৫২ ধারা রশিদ সহ অন্যান্য দাপ্তরিক কাগজ পত্র ছিড়ে ফেলেন এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে খাস কামরার দরজায় লাথি দিয়ে দরজা ভাঙ্গার চেষ্টা করেন। অবরুদ্ধ হয়ে বিবাদীদের ভয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও বকশিগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জকে ফোনে পরিস্থিতি জানালে বকশিগঞ্জ থানা পুলিশ এসে সাব রেজিস্টারকে উদ্ধার করেন।

এদিকে দলিল লেখকরা জানান, গত বছরের ১৫ অক্টোরব বকশিগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদান করেন আবদুর রহমান মুহাম্মদ তামীম। যোগদানের পর থেকেই দলিল লেখকসহ জমির দাতা-গ্রহীতাদের সঙ্গে অসদাচরণ করে আসছেন। কথায় কথায় দলিল লেখকদের সনদ বাতিলের হুমকি দেন। তাঁর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন দলিল লেখকরা। বুধবার হেবা দলিল করা নিয়ে দলিল লেখক এবং সাব-রেজিস্ট্রার এর মধ্যে বাতবিতন্ডতা হয়। এক পর্যায়ে দলিল লেখক আলী আহসান খোকা ও শহিদুল্লাহর সঙ্গে অসদাচরণ করেন এবং তাদের দুজনকেই ‘সাময়িক বহিষ্কার’করেন সাব-রেজিস্ট্রার। মুহূর্তেই এ ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে অন্য দলিল লেখকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। তাৎক্ষণিক অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও অসদাচরণের অভিযোগে বকশিগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রারকে নিজ কার্যালয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে দলিল লেখকরা। এ সময় সাব-রেজিস্ট্রার এর অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ করেন দলিল লেখকরা। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

বকশিগঞ্জ দলিল লেখক সমিতির সাবেক সভাপতি আলী আহসান খোকা বলেন, সাব-রেজিস্ট্রার মানুষকে মানুষ মনে করেন না। অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেছেন তিনি। কথায় কথায় দলিল লেখকদের সনদ বাতিলের হুমকি দেন। বুধবার বৈধ একটি দলিল না করে ফিরিয়ে দেন। কারণ জানতে চাইলে খারাপ আচরণ করেন এবং আমাদের দুইজনকে সাসপেন্ড করেন।

দলিল লেখক সমিতির সভাপতি ফিরোজ মিয়া বলেন, সাব-রেজিস্ট্রারের আচরণে সবাই অতিষ্ঠ। মনগড়াভাবেই চলছে সাব-রেজিষ্ট্রি অফিস। তাঁর অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে। তিনি যে সমস্ত অভিযোগ তুলে ধরে থানায় অভিযোগ করেছেন তা মিথ্যা বানোয়াট এবং ভিত্তিহীন।

সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুর রহমান মোহাম্মদ তামিম বলেন, আমি বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ থাকাকালীন সময়ে আমাকে সংবাদিকরা জানান যে, আমার অফিসে ০৩টি বালাম কাটা ছিঁড়া ও ঘসা মাজা হয়েছে। আমি প্রশিক্ষণ শেষে যোগদানের পরে মাননীয় জেলা রেজিস্ট্রার জামালপুর আমাকে উক্ত ঘটনার প্রতিবেদন দিতে বলেন। প্রতিবেদনে অভিযোগকারী কর্তৃক কিছু দলিল লেখকের টাকা লেনদেনের বিষয়ে অবহিত করে দলিল লেখক সমিতির সভাপতি ফিরোজ সরকারের নাম চলে আসলে তিনিসহ অন্য বিবাদীরা ক্ষোভের বর্হি প্রকাশ হিসাবে এই ঘটনাকে আরো ধ্বংসাত্বক করে তুলেন। তিনি আরো বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই কিছু দলিল লেখক তাঁর কাছে অনৈতিক আবদার করে আসছিলেন। তাদের কথামতো কাজ না করায় আমার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তারা। দলিল লেখকরা আমাকে প্রাণনাশের হুমকিও দিয়েছে। এই ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগ দায়ের এর পর বৃহস্পতিবার বিকেলে মেরুরচর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দলিল লেখক ইলিয়াস আলীকে আটক করেছে পুলিশ।

এ ব্যাপারে বকশিগঞ্জ থানার ওসি আব্দুল আহাদ খাঁন জানান, লিখিত অভিযোগ পেয়েছি, তদন্ত কাজ চলছে, আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। একজনকে আটক করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *