উপজেলার সংবাদজামালপুরবকশীগঞ্জ

বকশিগঞ্জ উপজেলা বিএনপি’র রাজনীতি উত্তপ্ত নেতৃত্বে অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধ নেতাকর্মীদের বিরোধ তুঙ্গে

কাফি পারভেজ, স্টাফ রিপোর্টার:

বকশিগঞ্জে ০৫ মে পদবঞ্চিত নেতাকর্মীদের পথসভার পর থেকে বকশিগঞ্জ উপজেলা বিএনপি এবং পদবঞ্চিত নেতাকর্মীদের পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন এবং একে অপরকে দোষারোপ করায় দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীরা বিব্রত অবস্থায় রয়েছে। হতাশ হয়ে পড়ছে দলের নেতাকর্মীরা। বিরোধ মিটছেই না। বরং বাড়ছেই। অভ্যন্তরীন কোন্দল ধীর গতিতে সংঘাতের দিকে এগুচ্ছে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, মত পার্থক্য থাকায় বিবদমান নেতাকর্মীদের মধ্যে কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছেনা। এক পক্ষের সাথে অপর পক্ষের সম্পর্ক যেন অহি-নকুল।

জানা যায়, বকশিগঞ্জ উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ তালুকদারের বিরুদ্ধে মিথ্যা বানোয়াট, ভিত্তিহীন অপপ্রচার ও সুনাম ক্ষুন্ন করার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় শহরের পুরাতন ইসলামী ব্যাংক ভবনে। উপজেলা ও পৌর বিএনপি’র ত্যাগী ও পদবঞ্চিত নেতাকর্মীর আয়োজনে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

সংবাদ সম্মেলনে আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, তাকে বহিস্কার নিয়ে যে তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে তা মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। আমার কোন ত্রুটি না থাকায় কেন্দ্রীয় বিএনপি আমার বহিস্কার আদেশ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে আব্দুর রউফ তালুকদার আরো বলেন, জামালপুর-১(দেওয়ানগঞ্জ-বকশিগঞ্জ) আসনে আওয়ামী লীগের দোসরদের বাদ দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুমের নেতৃত্বে কাজ করতে চায় বিএনপির নেতা কর্মীরা। তাই বর্তমান কমিটি বিলুপ্ত ঘোষনা করে আলোচনা সাপেক্ষে একটি কমিটি করে বিএনপি পরিচালনার দাবি জানান।

অপরদিকে বুধবার বকশিগঞ্জ পৌর বিএনপির কার্যালয়ে উপজেলা বিএনপি ও পৌর বিএনপিসহ সকল অঙ্গ সংগঠনের উদ্যোগে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম প্রিন্স বলেন, সাবেক সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ তালুকদার দলের কেউ নয়। দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকান্ড ও দলীয় সিদ্ধান্তের বাহিরে গিয়ে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন করায় দল থেকে তাকে আজীবনের জন্য বহিস্কার করে বলে তিনি জানান।

জাহিদুল ইসলাম প্রিন্স আরো বলেন, বিএনপি যখন সুসংগঠিত হতে যাচ্ছে এখন তাড়া আওয়ামী লীগের কাঁধে ভর দিয়ে বিএনপির ভিতরে ঢোকার জন্য বিভিন্ন পায়তারা শুরু করেছে। তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর উপজেলা বিএনপিতে যোগদান করেন আব্দুর রউফ তালুকদার। কেন্দ্রীয় বিএনপি’র অনুমোদন ক্রমে ২০০০ সালে আব্দুর রউফ তালুকদার উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি এবং মানিক সওদারগর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০৩ সালে সম্মলনের মাধ্যমে ফের আব্দুর রউফ তালুকদার উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি এবং মানিক সওদারগর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
২০০৯ সালের ২২ নভেম্বর বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লা আল নোমানের উপস্থিতিতে এক সম্মলনের মাধ্যমে আব্দুর রউফ তালুকদার সভাপতি এবং ফরিদ উদ্দিন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে ছিলেন।

২০০৯ সালের আব্দুর রউফ তালুকদার উপজেলা পরিষদ এর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। সে সময় নির্বাচন কমিশনারের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয় দলীয় পদ থাকা অবস্থায় শপথ গ্রহন করা যাবে না। এ কারণে তিনি শপথ গ্রহনের আগে উপজেলা বিএনপির সভাপতি পদ থেকে স্বেচ্ছয় পদত্যাগ করেন। পরবর্তিতে একই সালে নির্বাচন কমিশনারের অপর আরেকটি প্রজ্ঞাপনে তিনি ফের উপজেলা বিএনপির সভাপতি পদ ফিরে পান। ২০১৫ সালে ২১ নভেম্বর উপজেলা বিএনপি’র সম্মেলনে পুনরায় আব্দুর রউফ তালুকদার সভাপতি এবং ফরিদ উদ্দিন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

২০১৬ সালের ৭ অক্টোবর তৎকালিন কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম (টিপু) স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি আব্দুর রউফ তালুকদারের প্রাথমিক সদস্য পদসহ সকল পর্যায়ের পদ থেকে বহিস্কার করা হয়। পরে তার আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১২ নভেম্বর বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করে প্রাথমিক সদস্য পদ পুর্ণবহাল হয়। এরপর ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত বকশিগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে প্রার্থী হওয়ায় ২০২৪ সালের ২ মে আব্দুর রউফ তালুকদারকে ফের কেন্দ্রীয় বিএনপি বহিষ্কার করে। এর পর থেকে বিএনপি’র মূলধারার রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন।

তিনি ১৯৮৩ সালে বকশিগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদে প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আব্দুর রউফ তালুকদার। তিনি টানা চার বার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালে সর্বশেষ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন।

অপরদিকে ১৯৯৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর উপজেলা বিএনপি’র সম্মেলনে ওবায়দুল্লা মেম্বার সভাপতি এবং মানিক সওদাগর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে সমঝোতার মাধ্যমে মানিক সওদাগর সভাপতি এবং ওবায়দুল্লা মেম্বার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপি রাজনীতিতে আসার পর থেকে মানিক সওদাগর ২০০০ ও ২০০৩ সালে উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদকে দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৪ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে প্রার্থী হওয়ায় মানিক সওদাগরকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় বিএনপি। ফের ২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় বিএনপি তার বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়। এর পর মানিক সওদাগর ২০২০ সালে বকশিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়াও তিনি বকশিগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের এবং বিআরডিবি’র চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বকশিগঞ্জ বনিক সমিতির সভাপতি ছিলেন।

দীর্ঘ ৫ বছর পর ১৮ ফেব্রুয়ারি বকশিগঞ্জ উপজেলা ও পৌর বিএনপির দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দলটির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে কয়েকদিন তীব্র উত্তেজনা ও বিভক্তি দেখা দিলেও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্মেলন শেষ হয়। সম্মেলনে সেদিন নতুন কমিটি ঘোষণা না করা হলেও পরবর্তিতে ১৪ মার্চ সুপার ফাইভ কমিটিতে মানিক সওদাগরকে বকশিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি এবং জাহিদুল ইসলাম প্রিন্সকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।

এদিকে বকশিগঞ্জ উপজেলা বিএনপি এবং পদবঞ্চিত নেতাকর্মীদের পাল্টাপাল্টি মিছিল, সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলন এবং একে অপরকে দোষারোপ করায় দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীরা বিব্রত অবস্থায় রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *