উপজেলার সংবাদজামালপুরমেলান্দহ

প্রাণনাশের হুমকির মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে জামালপুরের আওয়ামী লীগ নেতা সোহেল চৌধুরী

জামালপুর প্রতিনিধি:
জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার চরবাণীপাকুরিয়া ইউনিয়নে এক সময়ের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা সোহেল চৌধুরী। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই নেতা ছিলেন যুবলীগের সাবেক সভাপতি এবং আওয়ামী লীগের সর্বশেষ জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক। রাজনৈতিক অঙ্গনে দৃপ্ত পদচারণা ও সংগঠক হিসেবে সুনাম অর্জনের পরও শেষ পর্যন্ত ষড়যন্ত্র, মামলা এবং প্রাণনাশের হুমকির মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। বর্তমানে তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইউরোপে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন।

সোহেল চৌধুরীর রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয় সাতবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের আস্থাভাজন হিসেবে। সাংগঠনিক দক্ষতা ও তৃণমূল পর্যায়ে নিবেদিত ভূমিকার কারণে তিনি অল্প সময়ে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী নেতা হিসেবে পরিচিতি পান। পাশাপাশি, ব্যবসায়ী হিসেবেও তিনি এলাকায় সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তার মালিকানাধীন ‘মেসার্স মাস্টার ফার্মেসি’ চিকিৎসা ও পরামর্শের জন্য এলাকার সাধারণ মানুষের নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

সোহেল চৌধুরী জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহমেদ চৌধুরীর ভাগ্নে। তার রাজনৈতিক প্রভাব ও পারিবারিক পরিচয়ের কারণে এলাকায় শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়। জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জামালপুর পৌরসভার মেয়র ছানোয়ার হোসেন ছানুর সঙ্গেও ছিল তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তবে এই প্রভাবশালী অবস্থান সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিরোধ ও বিতর্কের জন্ম দেয়। একাধিক মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, যা তাকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলে।

সোহেল চৌধুরী একজন সফল ঠিকাদারি ব্যবসায়ী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পল্লী উন্নয়ন একাডেমির অধীনে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের ঠিকাদারি কাজকে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার কামরুজ্জামানের শত্রুতা সৃষ্টি হয়। দুজনেই প্রকল্পটি পেতে সাবেক প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম এমপির কাছে তদবির করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজটি সোহেল চৌধুরী বাগিয়ে নেন। এখান থেকেই মূল অন্তর্দ্বন্দ্বের সূচনা, যা পরে রাজনৈতিক বিরোধ, হামলা এবং মামলার রূপ নেয়।
পরবর্তীতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাবেক মেম্বার আহমদ হাসানের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছায়। মনোনয়নপত্র বাতিল এবং সশস্ত্র হামলার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়। যদিও আদালতের আদেশে তার প্রার্থিতা বৈধ হয়, নির্বাচনের মাত্র ২-৩ দিন আগে সশস্ত্র হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। নির্বাচনী মাঠে উপস্থিত না থাকায় সামান্য ব্যবধানে তিনি পরাজিত হন। উল্লেখযোগ্যভাবে, তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী আহমদ হাসানও জয়ী হতে পারেননি। এই ঘটনার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের হতে থাকে। একটি মামলায় তিনি দণ্ডপ্রাপ্তও হন। বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলোর তদন্ত করছে।

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সোহেল চৌধুরীর ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়ে যায়। বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ বিভিন্ন সংগঠন তার বিচারের দাবি জানাতে থাকে। স্থানীয়ভাবে তার পরিবারের ওপর চালানো হয় রাজনৈতিক হামলা ও হয়রানি। প্রাণনাশের হুমকির মুখে সোহেল চৌধুরী দেশত্যাগে করেন। নিজের নাবালক সন্তান ও বৃদ্ধা মাকে দেশে রেখেই তিনি ইউরোপে পাড়ি জমান। বর্তমানে তার পুরো পরিবার এলাকা ছেড়ে পালিয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছে।

মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সোহেল চৌধুরী এ প্রতিবেদককে বলেন,”আমি আজীবন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। দলের নির্দেশেই কাজ করেছি। দলকে সুসংগঠিত করতে যা যা প্রয়োজন, আমি করেছি। এখন দেশে ফিরলে আমাকে হত্যা করা হবে—এটা আমি নিশ্চিত। তবে দল যদি পুনরায় ক্ষমতায় আসে, আমি অবশ্যই দেশে ফিরে আসব।”

একজন তৃণমূল রাজনীতিক, সংগঠক এবং সমাজসেবী হিসেবে রাজনীতিতে যাত্রা শুরু করা সোহেল চৌধুরী আজ রাজনীতির নির্মম বাস্তবতায় হয়ে পড়েছেন পরবাসী। ক্ষমতার লড়াই, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে গভীর ছায়া ফেলেছে। তার গল্পটি আজ তৃণমূল রাজনীতির উত্থান-পতনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *