উপজেলার সংবাদজামালপুরসদর

সাইবার বুলিং ও লিঙ্গভিত্তিক অনলাইন সহিংসতা প্রতিরোধে সচেতনতামূলক সেমিনার অনুষ্ঠিত

মোঃ রুহুল আমিন রাজু, জামালপুরঃ

“সাইবার বুলিং ও লিঙ্গভিত্তিক অনলাইন সহিংসতা : ঝুঁকি, প্রভাব ও প্রতিরোধ” শীর্ষক এক সচেতনতামূলক সেমিনার মঙ্গলবার (১৬ জুন ২০২৬) জামালপুরের পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ), জামালপুরের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, জামালপুরের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিক্ষার্থী, প্রশিক্ষণার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সমাজসেবীরা অংশগ্রহণ করেন। সেমিনারে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সাইবার বুলিং, নারীদের প্রতি ডিজিটাল সহিংসতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিরাপদ ব্যবহার এবং সচেতনতা বৃদ্ধির বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এবং প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, জামালপুরের মহাপরিচালক আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, “ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তির সুফল ভোগের পাশাপাশি এর ঝুঁকি সম্পর্কেও সবাইকে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সাইবার বুলিং ও অনলাইন সহিংসতা প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।”

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করেন বাংলাদেশ সাইবার বুলিং ও লিঙ্গভিত্তিক অনলাইন সহিংসতা: ঝুঁকি, প্রভাব ও প্রতিরোধ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ শেখ মাহাবুল হোসেন রাজীব, উপ-আঞ্চলিক পরিচালক। তিনি বলেন, “অনলাইন হয়রানি ও সাইবার বুলিংয়ের শিকার ব্যক্তিরা অনেক সময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তাই এসব ঘটনার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।”

বিশেষ আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন জামালপুর জেলার সিভিল সার্জন ডা. আজিজুল হক। তিনি বলেন, “সাইবার বুলিংয়ের ফলে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, হতাশা ও আত্মবিশ্বাসহীনতার মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই অনলাইন সহিংসতাকে শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত নয়, জনস্বাস্থ্যগত একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।”

মাদারগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “সাইবার অপরাধ বর্তমানে সমাজের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অপরাধীরা বিভিন্নভাবে মানুষকে হয়রানি করছে। সাইবার বুলিং বা অনলাইন সহিংসতার শিকার হলে ভুক্তভোগীদের নীরব না থেকে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।”

এ সময় বক্তব্য রাখেন ডা. মোবাশ্বিরা। তিনি বলেন, “নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে অনলাইন সহিংসতা প্রতিরোধে পরিবার ও সমাজকে আরও সংবেদনশীল হতে হবে। নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করতে নারী-পুরুষ সবার সম্মিলিত সচেতনতা প্রয়োজন।”

সেমিনারে বক্তারা বলেন, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। তবে এর অপব্যবহারের ফলে সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি, ভুয়া তথ্য প্রচার, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার মতো ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব অপরাধ শুধু ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না, বরং পরিবার ও সমাজের ওপরও বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করে।

বক্তারা আরও বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রত্যেক ব্যবহারকারীকে সচেতন হতে হবে। অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করা, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, অনলাইন হয়রানির ঘটনা দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং পরিবারে ডিজিটাল সচেতনতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সভায় বক্তারা বলেন, “সাইবার বুলিং ও লিঙ্গভিত্তিক অনলাইন সহিংসতা প্রতিরোধে শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার। নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মেলান্দহ উপজেলা নির্বাহী অফিসার জিন্নাতুল আরা, মেলান্দহ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মুনজুরুল কবীর মুনজুসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সুধীজন।

সেমিনারের শেষে অংশগ্রহণকারীরা অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের সচেতনতামূলক কর্মসূচি তরুণ প্রজন্মকে নিরাপদ, সচেতন ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *