বকশিগঞ্জ বিএনপির দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন বিলুপ্ত হয়নি আহবায়ক কমিটি ঘোষণাও হয়নি নতুন কমিটি

কাফি পারভেজ, স্টাফ রিপোর্টার:
জামালপুরের বকশিগঞ্জ উপজেলা ও পৌর বিএনপির দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে বকশিগঞ্জ খয়ের উদ্দিন মাদ্রাসা মাঠে উপজেলা ও পৌর বিএনপি যৌথভাবে সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দলটির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে কয়েকদিন থেকে তীব্র উত্তেজনা ও বিভক্তি দেখা দিলেও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্মেলন শেষ হয়। অনুষ্ঠিত সম্মেলনে জেলা ও উপজেলা বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সাত ইউনিয়নের তৃণমূলের কর্মীদের স্বর্তস্ফুর্ত অংশ গ্রহনে জনসভার মাঠ জনসমুদ্রে পরিনত হয়।
বকশিগঞ্জ খয়ের উদ্দিন মাদ্রাসা মাঠে সাজানো হয়েছে সম্মেলনের বিশাল আকৃতির দৃষ্টিনন্দন মঞ্চ। মঙ্গলবার দুপুরে দীর্ঘ ৫ বছর পর উপজেলা বিএনপির আহবায়ক মানিক সওদাগর এর সভাপতিত্বে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন জেলা বিএনপির সভাপতি ফরিদুল কবির তালুকদার শামীম।
সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল। কিন্তু তিনি না থাকায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির কোষাধ্যক্ষ জামালপুর-১ (দেওয়ানগঞ্জ-বকশিগঞ্জ) আসনের সাবেক এমপি দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা বিএনপি’র সদ্য নির্বাচিত সভাপতি এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ ও সাবেক এমপি এম. রশিদুজ্জমান মিল্লাত বলেছেন, শেখ হাসিনা আগে আমাদের তারেক রহমানকে বলেছিলেন, যদি বাপের বেটা হও, তাহলে বাংলাদেশে এসে বক্তব্য দাও। এখন শেখ হাসিনাকে বলছি, তুমি কত বড় বাপের বেটি, তুমি এসে বক্তব্য দাও। বাংলাদেশে আসো। আমার মনে হয় ঢাকাও লাগবে না, বকশিগঞ্জের লোকেরাই তাকে ভর্তা করে ফেলবেন।
তিনি আরো বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. ইউনূস, ছাত্র ও বিএনপিসহ সবাই মিলে আওয়ামী লীগকে ছাড় না দেয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। আওয়ামী লীগ এদেশের সম্পদের ৭৫ ভাগ নিয়ে চলে গেছে। এ দেশের উন্নতি আওয়ামী লীগের কারণে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। শেখ হাসিনা মানুষ হত্যাকারী। তাই তার এদেশে রাজনীতি করার কোন অধিকার নেই। এই দেশে কোন আওয়ামী লীগ থাকতে পারবে না। এখনও আওয়ামী লীগের যারা গ্রেপ্তার হয়নি ডেভিল হান্ট অপারেশনের মাধ্যমে তাদেরকে গ্রেপ্তার করতে হবে।
এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, আমি বিশ্বাস করি আগামী দিনে একদম গরীব পর্যায় থেকে শুরু করে যারা অনেক উচ্চ স্তরের মানুষ সবাই এখন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে এ দেশে বসবাস করবেন। এ ছাড়াও যারা পেটের দায়ে বা বিপদে পড়ে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়েছিলেন তাদের যাচাই-বাছাই করে দলে যোগদানের সুযোগ দেয়ার কথাও বলেন তিনি।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষকে বিজয়ী করার আহবান জানিয়ে এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, আপনারা ১৭ বছর যে ধৈর্য ধরে আছেন, এ বছরের মধ্যে নির্বাচন হবে, নির্বাচনে আপনারা ভোট দিবেন। শান্তি, সম্প্রীতি আর সহমর্মিতা বজায় রেখে নিজেদের মধ্যে ঐক্য রাখুন। আমি যদি এই এলাকায় নির্বাচিত হই বিগত সময়ের মতো সমতার ভিত্তিতে দ্রুততম সময়ে উন্নয়ন হবে।
মঙ্গলবার বিকালে বকশিগঞ্জ খয়ের উদ্দিন মাদ্রাসা মাঠে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে উপজেলা বিএনপির আহবায়ক মানিক সওদাগরের সভাপতিত্বে এবং পৌর বিএনপির আহবায়ক জাহিদুল ইসলাম প্রিন্সের সঞ্চালনায় প্রথম অধিবেশনে প্রধান বক্তার বক্তব্য রাখেন, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ময়মনসিংহ বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন। এছাড়াও সম্মেলনে সাবেক এমপি এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাতের পুত্র ব্যারিস্টার শাহাদাত বিন জামান শোভন, জামালপুর জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি খন্দকার আহসানুজ্জামান রুমেল, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শহিদুল হক খান দুলাল, সাংগঠনিক সম্পাদক লোকমান আহমেদ খান লোটন, শফিকুল ইসলাম সজিব, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতি শাহাজাহান শাওন,বকশিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক এ্যাডভোকেট মো. মোকাম্মেল হক, অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মোকাদ্দেছ রিপন, অধ্যাপক বজলুর রহমান, গোলাম রব্বানী, বীর মুক্তিযোদ্ধা নওশেদ আলী, পৌর বিএনপির সদস্য সচিব এ্যাডভোকেট মো. আনিছুজ্জামান গামা, পৌর বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক মো. আশরাফ আলী, মেরুরচর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম পুলক, নিলাক্ষিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মমতাজুর রহমান মমতাজ, সাধুরপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি গাজীউর রহমান মোল্লা, উপজেলা যুবদলের আহবায়ক বিপ্লব সওদাগর, পৌর যুবদলের আহবায়ক সাইফুল ইসলাম তালুকদার শাকিল, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক আশিকুর রহমান তুলন, উপজেলা ছাত্রদলের আহবায়ক জোবাইদুল ইসলাম শামীম প্রমুখ।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, এই সম্মেলনকে ঘিরে কয়েক দিন থেকে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করে। সম্মেলন সফল ও প্রতিহত করতে দলের নেতা-কর্মীরা বিভক্ত হয়ে পাল্টাপাল্টি মিছিল করে। সম্মেলন সফল করতে সোমবার সন্ধ্যার দিকে উপজেলা বিএনপির আহবায়ক মানিক সওদাগরের নেতৃত্বে মিছিল বের হয়। অন্যদিকে বকশিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রউফ তালুকদারে নেতৃত্বে সম্মেলন স্থগিতের দাবিতে সোমবার বিকেলে বিক্ষোভ মিছিল করে বিএনপির পদ বঞ্চিত নেতাকর্মীরা। এ নিয়ে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ও বিভক্তি দেখা দেয়। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে ও সম্মেলনের স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। অবশেষে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই সম্মেলন শেষ হয়।
এর আগে বিভক্তি নিরসন করতে কেন্দ্রীয় বিএনপির কোষাধ্যক্ষ ও জামালপুর-১ (বকশিগঞ্জ-দেওয়ানগঞ্জ) আসনের সাবেক এমপি এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাতের ঢাকা ও দেওয়ানগঞ্জের বাসায় উভয় পক্ষকে নিয়ে একাধিক বৈঠক হয় বলে জানা যায়। কিন্তু উভয় পক্ষই কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি হননি। বিভক্তি নিরসন না হওয়ায় গত কয়েকদিন থেকেই সম্মেলন সফল ও প্রতিহত করতে পাল্টাপাল্টি মিছিল সমাবেশ করে দুই পক্ষ । পাল্টাপাল্টি মিছিল সমাবেশে দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীরা বিব্রত অবস্থায় পরে।
অবশেষে মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় সংবাদ সম্মেলন করে উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবদুর রউফ তালুকদার গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সম্মেলনের দাবি জানান। তিনি বলেন, নেতৃত্ব সৃষ্টির মানেই সম্মেলন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই সম্মেলনে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারছেন না। তাই আমরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সম্মেলন চাই। সেই লক্ষ্যে আমাদের দাবি ছিল প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে কর্মী সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি করতে হবে। পরে উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটি ভেঙে দিয়ে তারপর উপজেলা ও পৌর সম্মেলন করতে হবে। আর ওই দাবিতে আমরা প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ করেছি। আর এই বিষয়গুলো জেলা, কেন্দ্র ও এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে জানিয়েছি। সম্মেলন ঘিরে এই মুহূর্তে যদি একটি বিশৃঙ্খলা ঘটে, তাহলে দলের ভাবমূর্তির ক্ষতি হবে। আজকে অনেক বাধাবিপত্তির পরও নেতা-কর্মীদের শান্ত করেছি। আর আমাদের দাবিগুলো কেন্দ্রীয় নেতারা দেখবেন আশা করি।
এদিকে বকশিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহবায়ক মানিক সওদাগর বলেন, সম্মেলন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে। সম্মেলন সফল করতে সকল প্রস্তুতি শেষ । সম্মেলন স্থগিত করতে নানা ষড়যন্ত্র করছে একটি পক্ষ। সম্মেলনের বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র সফল হবে না । দলের দু’সময়ে যাদের পাশে পাওয়া যায়নি তারা আজ ত্যাগী নেতা সেজেছে। বিগত ১৭ বছর যারা জেল জুলুম নির্যাতন সহ্য করেছে তারাই সম্মেলন সফল করবে।
দ্বিতীয় অধিবেশনে আহবায়ক কমিটি বিলুপ্তি করে নতুন কমিটি ঘোষণা করার কথা থাকলেও আহবায়ক কমিটি বিলুপ্তি করা হয়নি এবং নতুন কমিটিও ঘোষণা করা হয়নি।
এ ব্যাপারে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন সম্মেলনে দলীয় নেতা–কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে। সেই পর্যন্ত কমিটির আহবায়ক ও সদস্য সচিব দলের দায়িত্ব পালন করবেন।
