বকশিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী মহিষের দই সারা জাগিয়েছে সর্বত্র

কাফি পারভেজ, স্টাফ রিপোর্টার: শতবর্ষ ধরে মহিষের দুধের তৈরি দইয়ের জন্য জামালপুরের বকশিগঞ্জের নাম এখন দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বকশিগঞ্জ সদর ইউনিয়নের নঈম মিয়ার হাটে দীর্ঘদিন ধরে বিক্রি হয়ে আসছে মহিষের দুধ দিয়ে তৈরি ঘন ননিযুক্ত সুস্বাদু দই। বকশিগঞ্জ পৌর শহরের বাজারেও এই দই নিয়মিত পাওয়া যায়।
জানা গেছে, মহিষ পালন তুলনামূলক সহজ হওয়ায় উপজেলার বেশিরভাগ এলাকার মানুষ গরুর বদলে মহিষ পালন করে থাকেন। এখানকার মানুষ কৃষিকাজের পাশাপাশি মহিষের দুধ দিয়ে তৈরি দই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি কেমিক্যালমুক্ত মহিষের দুধের দই স্থানীয়দের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়। মহিষের দুধ প্রচুর ঘন হওয়ায় বাজারে বিক্রি করে আশানুরূপ দাম মেলে না। কিন্তু মহিষের দুধে পরিমাণে বেশি ননি এবং ঘনত্ব থাকায় ভালোমানের দই তৈরি হয়। আবার বাজারে এই দইয়ের চাহিদাও বেশি।
বাজারে পাওয়া গরুর দুধের দই তৈরিতে অর্থ এবং সময় দুটিই বেশি ব্যয় হয়। গরুর দুধ দিয়ে দই তৈরির সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া বেশ জটিল। মহিষের দুধ দিয়ে দই তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ। গরুর দুধের মতো মহিষের দুধ দীর্ঘক্ষণ জ্বাল দেওয়ার বা আলাদা করে দইয়ের বীজ মেশানোর প্রয়োজন হয় না। এর উচ্চ ফ্যাট ও ঘনত্বের কারণে এটি রেখে দিলে এমনিতেই জমে যায়। এতে খুব সহজেই মহিষের দুধের দই তৈরি করা যায়।
দুধ সংগ্রহ করার পর ফ্যানের নিচে বা ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করা হয়। এর আগে দই জমানোর জন্য যে বিশেষ মাটির হাঁড়ি ব্যবহার করা হয়, সেই মাটির হাঁড়ির ভিতরটা আগুনে ভালোভাবে পুড়িয়ে নেয়। পরে সেই হাঁড়িতে ঠান্ডা দুধ ঢেলে তিন দিন সেই অবস্থায় ঢেকে রাখা হয়। আগুন দিয়ে জ্বাল করানো বা সাচ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। মহিষের দুধে প্রচুর ক্রিম থাকায় এর মধ্যেই দই জমে যায়। দইয়ের গুণগতমান ভালো রাখতে অনেকেই আবার সেটি ফ্রিজেও রেখে দেন। দই তৈরির সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া শেষ হয়ে গেলে স্থানীয় নঈম মিয়ার হাটে কিংবা বকশিগঞ্জ হাটে বিক্রি হয় এই দই।
নঈম মিয়ার হাট বসে প্রতি শনি ও মঙ্গলবার আর বকশিগঞ্জ পৌর শহরের হাট বসে প্রতি রোববার ও বৃহস্পতিবার। প্রতি কেজি দই বিক্রি হয় ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা দরে। তবে দুই ঈদে এই দই বিক্রি হয় ২৬০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে। কয়েক পুরুষ ধরে এই অঞ্চলের কৃষক তথা ঘোষদের হাতে তৈরি এই মহিষের দুধের সুস্বাদু দই ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য মতে, বকশিগঞ্জের সাতটি ইউনিয়নে প্রায় দুই হাজার মহিষ পালন হচ্ছে। এর মধ্যে ২৮০টি মহিষ থেকে প্রতিদিন সাত’শ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। প্রতি কেজি দুধ থেকে প্রায় সাড়ে নয়’শ গ্রাম দই উৎপাদন হয়ে থাকে।
বকশিগঞ্জের মেরুরচরের মহিষ পালক আব্দুল মজিদ জানান, বিস্তীর্ণ চর এলাকায় সহজেই মহিষ পালন করা যায়। মহিষ পালন করে ও মহিষের দুধের দই বিক্রি করে তাদের আর্থসামাজিক অবস্থা ভালো বলে জানান তারা।
বগারচর ইউনিয়নের কৃষক মুছা মিয়া বলেন, দুধের চেয়ে দই-এ লাভ বেশি হওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষকরা দই প্রস্তুত করে থাকে।
বকশিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ জহুরুল হোসেন বলেন, মহিষের দই এ অঞ্চলের ঐতিহ্য। এখানের প্রস্ততকৃত মহিষের দই অত্যন্ত সুস্বাদু ও উন্নত। একে ব্র্যান্ডিং করে সারা দেশে পৌঁছে দিতে আমরা কাজ করছি।
