মামা, রুটি খাওয়ার ২০ টাকা দিবেন খ্যাত মনোহর আর নেই

মোঃ রুহুল আমিন রাজু, জামালপুর প্রতিনিধি
কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের স্মৃতি কোথাও যায় না। সময়ের স্রোতে অনেক মুখ হারিয়ে যায়, অনেক গল্প চাপা পড়ে যায় জীবনের ব্যস্ততায়। তবুও হঠাৎ কোনো একদিন পরিচিত কোনো রাস্তা, হাট-বাজার কিংবা কোনো পুরোনো স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়—একজন মানুষ ছিলেন, যাঁর উপস্থিতি ছিল খুবই সাধারণ, অথচ স্মৃতিতে তাঁর জায়গাটি ছিল অসাধারণ।
তেমনই এক পরিচিত মুখ ছিলেন মনোহর আলী পাগলা।
জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের নলছিয়া গ্রামের বাসিন্দা মনোহর আলীকে এলাকার মানুষ ‘পাগলা’ নামেই চিনতেন। কিন্তু তাঁকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁরা জানেন—এই মানুষটির ভেতরে ছিল শিশুর মতো সরলতা, মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং অসাধারণ ভদ্রতা।
তিনি কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেন না। পরিচিত-অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন হাসিমুখে। পরিচিত কাউকে দূর থেকে দেখতে পেলেই এগিয়ে যেতেন। তারপর সালাম দিতেন, কখনো নিজের মতো করে সেলুটও দিতেন। এরপর সেই চিরচেনা প্রশ্ন—
“মামা, রুটি খাওয়ার ২০ টাকা দিবেন মামা?”
কথাটি হয়তো খুবই সাধারণ। কিন্তু এই একটি বাক্যের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে মেলান্দহের অনেক মানুষের অসংখ্য স্মৃতি।
কেউ তাঁকে ২০ টাকা দিতেন, কেউ হয়তো খাবার কিনে দিতেন। আবার কেউ হয়তো হাসতে হাসতে তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলতেন। মনোহর আলীর কাছে কে কত টাকা দিলেন, সেটিই বড় বিষয় ছিল না; মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়া, একটু কথা বলা এবং আপন করে নেওয়াটাই যেন তাঁর কাছে ছিল আনন্দের।
রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার থেকে শুরু করে জামালপুর জেলা শহরেও তাঁর চলাচল ছিল। কখনো তাঁকে একা একা পথে হাঁটতে দেখা যেত, কখনো কোনো বাজারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত। আবার অনেক সময় নিজের বাড়িতেই থাকতেন। কিন্তু যেখানেই থাকতেন, তাঁর সরল উপস্থিতি আশপাশের মানুষের নজর কাড়ত।
তাঁর মধ্যে ছিল এক ধরনের নির্মল সরলতা। পৃথিবীর হিসাব-নিকাশ, চাওয়া-পাওয়ার জটিলতা কিংবা মানুষের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ যেন তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি মানুষকে সম্মান করতেন, আর মানুষও তাঁর এই সরলতার প্রতি মমতা দেখাত।
মনোহর আলী হয়তো সমাজের প্রচলিত অর্থে সফল মানুষ ছিলেন না। তাঁর ছিল না বড় কোনো পদ-পদবি, ছিল না অর্থ-বিত্তের অহংকার। কিন্তু তাঁর ছিল এমন একটি সম্পদ, যা অনেকের মধ্যেই থাকে না—মানুষকে আপন করে নেওয়ার সহজ ক্ষমতা।
তাঁর হাসি ছিল সহজ। কথা ছিল সাদামাটা। চাওয়া ছিল সামান্য। আর মানুষের প্রতি তাঁর সম্মান ছিল অকৃত্রিম।
আজ হয়তো সময় অনেক বদলে গেছে। নলছিয়া গ্রামের সেই চেনা পথ, মেলান্দহের সেই হাট-বাজার কিংবা জামালপুর শহরের ব্যস্ত রাস্তা আগের মতোই আছে। মানুষও চলাফেরা করছে। কিন্তু কোথাও হঠাৎ মনোহর আলীর সেই চেনা মুখটি চোখে পড়ে না।
তবুও স্মৃতির ভেতর তিনি রয়ে গেছেন।
কোনো এক পরিচিত মানুষ হয়তো আজও তাঁকে মনে করে মুচকি হাসেন। কারও মনে পড়ে তাঁর সালাম দেওয়ার ভঙ্গি। কারও কানে হয়তো এখনো বাজে সেই চিরচেনা ডাক—
“মামা, রুটি খাওয়ার ২০ টাকা দিবেন?”
এই একটি কথাই যেন তাঁর জীবনের একটি ছোট্ট পরিচয় হয়ে গেছে।
মানুষের জীবন খুব বড় কোনো ঘটনার কারণেই শুধু স্মরণীয় হয় না। কখনো একজন মানুষের ছোট ছোট আচরণ, ভালো ব্যবহার, সরলতা এবং মানুষের প্রতি মায়াই তাকে অন্যদের স্মৃতিতে বাঁচিয়ে রাখে।
মনোহর আলীও তেমনই একজন।
তাঁকে হয়তো অনেকে ‘পাগলা’ বলে ডাকতেন। কিন্তু তাঁর সরলতা, ভদ্রতা, মানুষের প্রতি সম্মান এবং মায়াময় আচরণ মনে রাখলে মনে হয়—নামের আড়ালে থাকা মানুষটি ছিলেন খুবই আপন, খুবই সহজ এবং খুবই নির্মল।
জীবনের ব্যস্ততায় আমরা অনেক মানুষকে ভুলে যাই। কিন্তু কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়া যায় না। তাঁরা আমাদের জীবনের কোনো এক সময়ের সঙ্গে, কোনো এক রাস্তার সঙ্গে, কোনো এক বাজারের সঙ্গে কিংবা কোনো এক হাসির স্মৃতির সঙ্গে মিশে থাকেন।
মনোহর আলী পাগলা ছিলেন তেমনই এক মানুষ—যাঁর কোনো বড় পরিচয় ছিল না, কিন্তু যাঁকে ঘিরে আছে অসংখ্য ছোট ছোট ভালোবাসার স্মৃতি।
হয়তো একদিন তাঁর কথা কেউ আর নতুন করে বলবে না। কিন্তু মেলান্দহের কোনো পুরোনো পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কারও মনে পড়ে যাবে সেই মানুষটির কথা—যিনি সালাম দিয়ে হাসিমুখে বলতেন,
“মামা, রুটি খাওয়ার ২০ টাকা দিবেন মামা?”
আর তখন হয়তো অজান্তেই মনে হবে—
আহা! মানুষটি কত সরলই না ছিলেন!
