হাতির পিঠে রাজকীয় বিদায়, স্বর্ণের আংটিতে ভালোবাসার স্মৃতি জামথল টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএমটি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষকে অশ্রুসিক্ত বিদায়

মোঃ মানিক ইসলাম:
দীর্ঘ ২৩ বছরের কর্মজীবনের ইতি টেনে প্রিয় প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নিলেন বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার ৫ নম্বর কাজলা ইউনিয়নের জামথল গ্রামে অবস্থিত জামথল টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএমটি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ আলহাজ্ব এ এস এম রফিকুল ইসলাম। তবে এ বিদায় ছিল না আর দশটি বিদায়ের মতো। ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর আবেগে ভরা ব্যতিক্রমী আয়োজনে হাতির পিঠে চড়িয়ে তাঁকে দেওয়া হলো রাজকীয় বিদায়।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই কলেজ প্রাঙ্গণে শুরু হয় ব্যতিক্রমী এ বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন। প্রিয় অধ্যক্ষকে শেষবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানাতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে কলেজজুড়ে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জামথল টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএমটি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শেখ মো. আব্দুর রাজ্জাক। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জামথল টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএমটি কলেজের সভাপতি এস এম মিকাইল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সারিয়াকান্দি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার সঞ্জয় কুমার পাল।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সারিয়াকান্দি উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মহিদুল ইসলাম, জামথল টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএমটি কলেজের সিনিয়র প্রভাষক (কম্পিউটার অপারেশন) রুহুল আমিন এবং অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা ও অধ্যক্ষ এ এস এম রফিকুল ইসলামের সহধর্মিণী মোছা. শাহিনা বেগমসহ কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
বিদায় সংবর্ধনার শুরুতেই শিক্ষকরা প্রিয় অধ্যক্ষকে ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করে নেন। এরপর একে একে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় ক্রেস্ট ও বিভিন্ন উপহার। দীর্ঘদিনের সহকর্মীকে বিদায় জানাতে গিয়ে অনেকের চোখে দেখা যায় আবেগের ছাপ। কেউ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন, আবার কেউ নীরবে প্রিয় অধ্যক্ষের বিদায়ের মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করে রাখেন।
সব আয়োজনকে ছাপিয়ে যায় হাতির পিঠে চড়িয়ে অধ্যক্ষ এ এস এম রফিকুল ইসলামকে বিদায় জানানোর দৃশ্য।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভালোবাসায় হাতির পিঠে তাঁর এই রাজকীয় বিদায় মুহূর্তটি পরিণত হয় অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণে।
বিদায়ী বক্তব্যে অধ্যক্ষ আলহাজ্ব এ এস এম রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমি ২০০৩ সাল থেকে এই কলেজে দায়িত্ব পালন করে আসছি। দীর্ঘদিনের মহামূল্যবান দায়িত্ব শেষে আজ আমার ব্যতিক্রমী বিদায় সংবর্ধনা সম্পন্ন হলো। বিদায়বেলায় এমন আয়োজন সত্যিই আমাকে মুগ্ধ করেছে। হাতির পিঠে রাজকীয়ভাবে দেওয়া এই বিদায় আমার জীবনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, “জামথল টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএমটি কলেজ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আমি আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি। শুধু তাই নয়, কাজলা ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেও জনগণের বিভিন্ন সেবায় নিয়োজিত থাকার সুযোগ পেয়েছি। এই প্রতিষ্ঠান ও এখানকার মানুষ আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাই আজকের এই বিদায় আমার জন্য আনন্দের পাশাপাশি অত্যন্ত আবেগেরও।”
অনুষ্ঠানে আবেগঘন আরেকটি মুহূর্তের সৃষ্টি হয় অধ্যক্ষের সহধর্মিণী মোছা. শাহিনা বেগম যখন স্বামী এ এস এম রফিকুল ইসলামকে ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে একটি স্বর্ণের আংটি উপহার দেন। দীর্ঘ কর্মজীবনের সঙ্গীকে বিদায়ের দিনে দেওয়া এই উপহার অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবার মাঝে আবেগের সৃষ্টি করে।
অধ্যক্ষের ব্যতিক্রমী বিদায় সংবর্ধনাকে স্মরণীয় করে তুলতে হাতির আয়োজনসহ অনুষ্ঠানের বিভিন্ন প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করেন কলেজের সিনিয়র প্রভাষক রুহুল আমিন। তাঁর সহযোগিতায় হাতির আয়োজন থেকে শুরু করে অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী সংগ্রহ ও অন্যান্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অতিথি ও শিক্ষকরা অধ্যক্ষ এ এস এম রফিকুল ইসলামের দীর্ঘ কর্মজীবন, শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা, প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ এবং সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্কের নানা স্মৃতি তুলে ধরেন।
এক পর্যায়ে বিদায়ের আবেগ আরও ঘনীভূত হয়ে ওঠে। যাঁর হাত ধরে দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানটি এগিয়েছে, সেই প্রিয় অধ্যক্ষ যখন বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সবার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছিলেন, তখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে নেমে আসে বিষণ্নতা। ফুলেল শুভেচ্ছা, ক্রেস্ট, উপহার আর ভালোবাসায় ভরা স্মৃতিগুলো যেন বলে দিচ্ছিল—প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের সমাপ্তি হলেও হৃদয়ের সম্পর্কের কখনো বিদায় হয় না।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভালোবাসায় আয়োজিত এই ব্যতিক্রমী বিদায় সংবর্ধনা তাই শুধু একটি বিদায় অনুষ্ঠান নয়, হয়ে রইল দীর্ঘ ২৩ বছরের কর্মজীবনের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার এক আবেগঘন স্মারক।
